রবিবার ২ আগস্ট ২০২৬ - ১৭:৫৭
আরবাঈন হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর চিরন্তন বার্তার ফসল

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি:

আরবাঈন হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর চিরন্তন বার্তার ফসল

নতুন নতুন সংশয়ের জবাব দিতে হাওযাকে জ্ঞানগত গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেছেন, আরবাঈনের মহাআন্দোলন হযরত জয়নাব কুবরা (সালামুল্লাহি আলাইহা)-এর সেই চিরন্তন বার্তারই ফল, যার সারকথা—অত্যাচারীরা সত্যের কণ্ঠকে কখনো স্তব্ধ করতে পারে না।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেয়ীর সঙ্গে দামাভান্দে এক সাক্ষাতে আরবাঈন উপলক্ষে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন, আরবাঈনের এই মহাসমাবেশ ‘ইয়া হুসাইন’-এর সংস্কৃতি এবং হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.)-এর চিরন্তন বার্তারই বাস্তব প্রতিফলন।

তিনি বলেন, আরবাঈনের এই বিশ্বজনীন জাগরণ সেই অমর বার্তারই ফসল, যা কারবালার পর হজরত জয়নাব (সা.) তাঁর ভাষণ ও অবস্থানের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন।

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন, কুফায় হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর ভাষণ কেবল শোক ও বেদনার ভাষণ ছিল না; বরং তা ছিল উমাইয়া শাসকদের জবরবাদী (নিয়তিবাদী) চিন্তার বিরুদ্ধে এক গভীর আকীদাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঘোষণা।

তিনি বলেন, যখন উবাইদুল্লাহ ইবন জিয়াদ হযরত জয়নাব (সা.আ.)-কে বলেছিল, ‘দেখলে, আল্লাহ তোমার ভাইয়ের সঙ্গে কী করেছেন?’—তখন সে নিজের অপরাধকে আল্লাহর ফয়সালার নামে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। এর জবাবে হজরত জয়নাব (সা.) ঘোষণা করেন—

ما رأيتُ إلا جميلاً.

অর্থাৎ, “আমি তো সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।”

আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে হত্যাকাণ্ড সুন্দর ছিল; বরং আল্লাহর পথে শাহাদাত ও তাঁর ফয়সালার মধ্যেই তিনি সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, হত্যাকারী আল্লাহ নন; বরং অপরাধীরাই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে। এভাবেই হযরত জয়নাব (সা.আ.) উমাইয়াদের জবরবাদী মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

তাফসিরে তাসনিম চার প্রজন্মের সম্মিলিত সাধনার ফল
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন, গত চল্লিশ বছর ধরে হাওযার শিক্ষক ও তালাবাদের চার প্রজন্ম নিরবচ্ছিন্নভাবে পবিত্র কুরআনের তাফসির নিয়ে গবেষণা ও অধ্যবসায়ে নিয়োজিত রয়েছে। প্রতিটি প্রজন্ম প্রায় এক দশক ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে।

তিনি বলেন, তাফসিরে তাসনিম রচনায় দীর্ঘ সময় লেগেছে, কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন জ্ঞান, দার্শনিক ও সামাজিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে এবং প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআনের আলোকে অনুসন্ধান করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “এই তাফসির কোনো এক ব্যক্তির কৃতিত্ব নয়। এটি নিছক সৌজন্যমূলক বক্তব্যও নয়; বরং বাস্তবতা হলো, তাফসিরে তাসনিম হাওযায়ে ইলমিয়ার সম্মিলিত জ্ঞানের সাধনারই ফল।”

সংশয়ের জবাব দিতে হাওযাকে হতে হবে জ্ঞানগতভাবে গতিশীল
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি জোর দিয়ে বলেন, হাওযায়ে ইলমিয়াকে সবসময় নতুন নতুন সংশয়, সমালোচনা ও প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আর তা তখনই সম্ভব হবে, যখন তারা নিজেদের জ্ঞানগত ব্যাপকতা ও গবেষণাগত গতিশীলতা বজায় রাখবে।

তিনি আরও বলেন, «أصالة الحرية» (আসালাতুল হুররিয়াহ) এবং এ-সম্পর্কিত অন্যান্য মৌলিক নীতিমালাও হাওযায় গবেষণাভিত্তিকভাবে পাঠদান ও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

গায়েবের জ্ঞান বিচারিক রায়ের ভিত্তি নয়
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন, গায়েবের জ্ঞান ইসলামী বিচারব্যবস্থায় রায় প্রদানের দলিল নয়। এ কারণেই মাসুমগণ (আ.) আল্লাহপ্রদত্ত গায়েবের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বিচারকার্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও শপথের ভিত্তিতেই রায় দিতেন।

তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিস উদ্ধৃত করেন—

إِنَّمَا أَقْضِي بَيْنَكُمْ بِالْبَيِّنَاتِ وَالْأَيْمَانِ.

অর্থাৎ, “আমি তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও শপথের ভিত্তিতেই বিচার করি।”

তিনি বলেন, কেউ যদি মিথ্যা সাক্ষ্যের মাধ্যমে অন্যের অধিকার আত্মসাৎ করে, তবে প্রকৃতপক্ষে সে নিজের জন্য জাহান্নামের আগুনই সঞ্চয় করে। তবে বিচার হবে শরিয়তের নির্ধারিত বিধান এবং দৃশ্যমান প্রমাণের ভিত্তিতেই।

মুমিনদের উপস্থিতিই আল্লাহর সাহায্যের বহিঃপ্রকাশ
বক্তব্যের অপর অংশে তিনি ইসলামী বিপ্লব ও দেশের প্রতিরক্ষায় জনগণের আত্মত্যাগী উপস্থিতিকে আল্লাহর সাহায্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি পবিত্র কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করেন—

هُوَ الَّذِي أَيَّدَكَ بِنَصْرِهِ وَبِالْمُؤْمِنِينَ.

অর্থাৎ, “তিনিই সেই সত্তা, যিনি তাঁর সাহায্য এবং মুমিনদের মাধ্যমে আপনাকে শক্তিশালী করেছেন।” (সূরা আল-আনফাল: ৬২)

তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনের সাহায্যের জন্য মুমিনদেরই এগিয়ে আনেন। নারী-পুরুষ, যুবক ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সচেতন উপস্থিতিই আল্লাহর নুসরতের বাস্তব প্রকাশ।

তিনি আরও বলেন, যে মহান আল্লাহ ইসলামের সূচনালগ্নে বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় দান করেছিলেন, আজও তিনিই মুমিন জাতিকে সাহায্য করতে সক্ষম। বদরের যুদ্ধে যেমন মুসলমানরা বিজয়ের আশা করেনি এবং শত্রুরাও পরাজয়ের আশঙ্কা করেনি, তবুও আল্লাহর ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছিল।

বক্তব্যের শেষাংশে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি ইসলাম ও ইসলামী বিপ্লবের সকল শহিদের, বিশেষ করে শহিদ নেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন, তিনি যেন তাঁদের কারবালার শহিদদের সঙ্গে মাহশরে সমবেত করেন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের এই ঐশী আমানত রক্ষার তাওফিক দান করেন, যাতে তারা এ পতাকা তার প্রকৃত অধিকারী হযরত ওয়ালিউল আসর ইমাম মাহদী (আ.ফা)-এর হাতে সমর্পণ করতে সক্ষম হন।

আরবাঈন হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর চিরন্তন বার্তার ফসল

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha